হাফিজুল ইসলাম (ঢাকা অফিস) : একটা সময় আমাদের সমাজে এমন ধারণা ছিল যে, নারীরা শুধু ঘরের কাজই করবে। রান্নাকরা, ঘর গোছানো, ছেলে-মেয়ে লালন-পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে তাদের জগৎ। নারীরা এক সময় উৎপাদনশীল অর্থনীতির মূলধরায় সরাসরি সম্পৃক্ত হবেন-এটা অনেকে কল্পনাও করতে পারতেন না। তারা ভাবতেই পারতেন না যে, একটি নারী জীবনে অনেক কিছুই করতে পারে।
কিন্তু এই নারীরাও পারে তাদের দক্ষতা দিয়ে একজন পুরুষের মত জীবন সাজাতে। পুরুষদের ধারণা ছিল নারীরা বাইরে কাজ করতে পারবে না, তাদের ঘরের কাজই সামলাতে হবে। তাছাড়া অনেক পুরুষই তাদেরকে গোলাম বানিয়ে রাখতে চায়। এমন সব ভ্রান্ত ধারণা যারা মনের মধ্যে পুষে রেখেছিলেন গত দুই দশকে তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছেন লক্ষ-লক্ষ সাহসী নারী।
সবক্ষেত্রে নারীরা যে এগিয়ে- সেটা এখন খুবই দৃশ্যমান। সর্বোচ্চ আদালত, শিক্ষক ,প্রসাশন, সশস্ত্র বাহিনী, নারীসেনা, নারী সাংবাদিক, ট্রেনচালক, ওসি, ডিসি, ইউএনও, সংসদ সদস্য- সবক্ষেত্রে নারীদের এখন জয়জয়কার। প্রায় ২৮ বছর ধরে যে দেশের সরকার প্রধানের দায়িত্বে নারী, সেই দেশের নারীরা কী করে অর্থনীতির প্রাণশক্তি ব্যবসায় পিছিয়ে থাকবেন? তাই তো সংসারের পাশাপাশি নারীদের একটি বড় অংশ নিজ হাতে সামলাচ্ছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার সফল নারী উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে ছোট মূলধন নিয়েই শুরু করেছেন ব্যবসা ও সামাজিক উন্নয়স মুলক প্রতিষ্ঠান। যোগ্যতা আর মেধা দিয়ে সেই ছোট মূলধন আজ রূপ নিয়েছে বড় পুঁজিতে। নিজেদের পাশাপাশি অসংখ্য বেকারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন তারা।

ঠিক এমনিই একজন নারী উদ্যোক্তা ‘শিউলি খাতুন’’। একজন কৃষক পরিবারের । মিরপুর উপজেলার আমলা প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জাহানারা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে এস.এস.সি পাশ করেন। এরপর আমালা সরকারি ডিগ্রী কলেজ থেকে ২০০৫ সালে এইচ.এস.সি পাশ করেন। একই কলেজ থেকে বিএতে ভর্তি হন পড়াশুনার পাশাপাশি অগ্রসর হন কর্ম জীবনে। তিনি তখন থেকেই চিন্তা করেছেন নিজে কিছু করবেন সাথে সমাজের গ্রামীন নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহযোগীতা করার পাশাপাশি গ্রামের অবহেলিত প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ শুরু করেন।
শুরু করেন জীবনের নতুন যুদ্ধ। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কাজতে হবে এমন ভাবনা সবসময়’ কিন্তু কিভাবে সম্ভব! প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করতে অর্থের প্রয়োজন জমি ও ঘরের প্রয়োজন। ২০০৯ সালের প্রতিবন্ধী বিশেষ স্কুল নীতিমালা অনুসরন করে ২০১৫ সালে নিজ বাড়ীর বারান্দা থেকে শুরু করেন। পরবর্তীতে তৃতীয় সংস্করনের মাধ্যেমে কুষ্টয়া মিরপুর চিথলীয়া ইউনিয়নে পহারপুর গ্রামে পাহারপুর বাধগ্রস্থ শিশু বিদ্যালয় স্থাপন করেন।বর্তমানে বিদ্যালটির অধীনে প্রায় ৩১৫ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অধ্যায়ন রত রয়েছে। বিদ্যালটিতে ১৩ জন সহকারী শিক্ষক ও ৮ জন থ্যারাপিষ্টসহ মোট ৩০ জন কর্মচারী আছেন। যাদের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে প্রতি মূহূর্ত কাজ করে যাচ্ছেন অত্রবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক শিউলি খাতুন। ফলে অবহেলীত অসহায় দুস্থ প্রতিবন্ধীরা পাছ্ছে শিক্ষা সহায়ক উপবিত্তি সহ নানান সুবিধা।
তিনি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন দুস্থ অসহায় স্বামী পরিত্যাক্তা, গ্রামের দরিদ্র নারীদের করেছেন কর্মস্থান। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, যেমন: সূচি কর্মের কাজ, হ্যান্ডপ্রিন্ট, ব্লক বাটিক, ভেজিটেবল ডাইং, স্কিন প্রিন্ট, টেলারিং, নকশী কাঁথা সেলাই, সচেতনতা মূলক প্রশিক্ষণ। মিলেছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং হয়েছে সচেতন। পরিবারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এতে করে নিজেদের উন্নতির সাথে সাথে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন তারা।
অর্থনৈতিক মুক্তির ফলে নারী শিক্ষার অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে নানা মানুষের নানা কথা ও বাঁধা উপেক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, একজন নারীকে ঘর থেকে বের হয়ে যখন বাহিরের জগতে নিজের অবস্থানকে শক্ত ভাবে দাঁড় করতে হয় তখন নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে হয়।
বাংলাদেশ ১৭ কোটি মানুষের দেশ, যার অর্ধেক জনসংখ্যায় নারী। তাই দেশের এই অর্ধেক জন গোষ্টীকে পিছনে রেখে শুধু মাত্র পুরুষরাই দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন একে অপরের সহযোগিতা। পুরুষদেরও উচিত হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিযে সহযোগিতা করা, এতে করে যেমন প্রতিটি গ্রামীন পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নতি হবে তেমনি নারী পুরুষ একে অপরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সহযোগিতা করলে দেশ ও জাতিকে অর্থনৈতিক ভাবে আরো শক্ত অবস্থানে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
নারী উদ্যোক্তা শিউলি খাতুন রির্পোটারকে বলেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারীদের ও প্রতিবন্ধীদের উন্নতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে এবং সামাজিক ভাবে মাথা উচুঁ করে দাড়ানোর জন্য যথেষ্ট সহযোগীতা করে যাচ্ছেন। এবং এই সরকারের সময়কালেই সবচেয়ে বেশি নারী ও প্রতিন্ধীদের উন্নত হয়েছ।

শিউলি খাতুন আরো বলেন, প্রতিবন্ধী ও অবহেলীত নারীরা এ দেশের বোঝা নয় সম্পদে পরিনত করাই আমার লক্ষ। এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, মাথা উচুঁ করে দাঁড়াবে এদেশের অবহেলীত নারী সমাজ ও প্রতিন্ধীরা ।
এই উদ্দ্যেক্তা প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কাজের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনৈতিক র্কমকান্ডে অংশগ্রহণ কারায় বিভিন্ন সময় নানা পুরষ্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১৭ সালে সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখেছেন যে নারী কেটাগরীতে নিজ উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা পেয়েছেন।এই সম্মাননা পাওয়া তার কাজের প্রতি আরো উৎসাহ বাড়িয়ে দিয়েছে।
Leave a Reply