গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন হল বাংলাদেশের সংবিধান। সংবিধানের ৭(১)অনুচ্ছেদে পরিস্কারভাবে উল্লেখ আছে যে,এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন।সর্বোচ্চ এই ধোকাবাজি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা যেতে পারে। রিমান্ড কি ? রিমান্ডের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ফৌজদারি কার্যবিধিতে উল্লেখ না থাকলেও প্রচলিতভাবে জানা যায় যে,একজন আসামিকে গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামির কাছ থেকে অপরাধের তথ্য উৎঘাটন করা সম্ভব না হলে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে আসামিকে পূর্নাঙ্গ জিজ্ঞাসাবাদের লক্ষে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে অপরাধের তথ্য উৎঘাটনের ব্যবস্থা করার নামই রিমান্ড। অসাংবিধানিক রিমান্ডঃ— বাংলাদেশের সংবিধানে রিমান্ড সম্পর্কে যেসব অনুচ্ছেদ আছে তা কোনভাবেই রিমান্ডকে বৈধতা দেয়না।সংবিধানের ৩৫(৪)অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেযে,কোন অপরাধের দায়ে কোন ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবেনা, অর্থাৎ রিমান্ডে নেয়ার পর যে কাজটি সাধারনত করা হয় তা সংবিধানের উপরোক্ত ৩৫(৪)অনুযায়ী অবৈধ ও অসাংবিধানিক।সংবিধানের ৩৫(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিমান্ড যে অবৈধ তার আবার সাংবিধানিক যৌক্তিকতা নির্দেশিত আছে অনুচ্ছেদ ২৬(এ)। এখানে বলা হয়েছে, এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামন্জস্যপূর্ন সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামন্জস্যপূর্ন এই সংবিধান প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততোখানি বাতিল হইয়া যাইবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবিধান রচিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে কিন্তু ফৌজদারি কার্যবিধি প্রনীত হয়েছিল ১৮৯৮ সালে,ফলে আমাদের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান কার্যকর হওয়ার ফৌজদারি কার্যবিধির তথাকথিত ১৬৭ ধারার প্রচলিত রিমান্ড সাংবিধানিকভাবে বাতিলল ও অবৈধ।তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে সাংবিধানিভাবে রিমান্ড বাতিল হওয়ার পরেও তা কেন আমাদের দেশে বহাল তবিয়াতে আছে ? এ প্রশ্নের নানাবিধ উত্তর আসতে পারে, আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা কাঠামো বিশেষ করে আমাদের দেশের আইনাঙ্গনের শিক্ষা কাঠামো মূলত এর জন্য দায়ী। রিমান্ড চায় পুলিশ,আমরা কি কখনও গোটা পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম ভিত্তিক আইনের বিধিগুলো খতিয়ে দেখেছি ? সম্ভবত না,কারন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের সর্বোচ্চ ডিগ্রি এল এল,এম করেও সে ধরনের শিক্ষা হয়তো আমরা পাইনি।অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো আমাদের সিলেবাসেও এ সম্পর্কে কোন নাম গন্ধ নেই।শিক্ষা কাঠামোগত এ দূর্বলতার কারনে আইনজীবী হওয়ার পরও আমাদেরকে আতঙ্কগ্রস্ত থাকতে হয় সংবিধান পরিপন্থী তথাকথিত রিমান্ড নিয়ে।দেশের আইনাঙ্গনের শিক্ষকেররা কখনও রাজশাহীতে অবস্থিত সারদা পুলিশ একাডেমিতে পুলিশকে দেয়া ট্রেনিং ম্যানুয়ালের সঙ্গে আইন বিভাগের সিলেবাসের তুলনা করেছেন কি ? সম্ভবত না আর না করার কারনে আমরা সে ধরনের তুলনামূলক বা উন্নত আইনের শিক্ষা আইন বিভাগ থেকে পাইনি,ফলে আইনের ডিগ্রিধারী আইনজীবীরা অসাংবিধানিক রিমান্ডকে নিয়ে কোনরুপ উচ্চবাচ্যই করেননা এবং নিরবে একটি বড়ো ধরনের অন্যায়কে প্রস্রয় দিয়ে আইন চর্চা করে যাচ্ছেন। শিক্ষা কাঠামোর এ ত্রুটির কারনে বিচার অঙ্গনে আইনজীবীদের মাঝে যেমন শিক্ষার দৈন্যতা তেমনি রিমান্ডের আদেশদাতা ম্যাজিস্ট্রেটের মাঝেও এ দৈন্যতা গভীরভাবে পরিলক্ষিত হয়। পুলিশের চাওয়া রিমান্ড মন্জুর করাটাই মনে হয় আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।রিমান্ড ও সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়ঃ—-ব্লাষ্ট বনাম বাংলাদেশ (রিপোর্টেড ৫৫ ডিএলআর. পেজ ৩৭৬)মামলায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রিমান্ড সম্পর্কিত এক যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছেন, রায়ে উল্লেখিত ১৫ টি নির্দেশনার মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ন গুলো নিম্নরুপ,(নির্দেশনা –১) যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা আবেদন করেন তাহলে তিনি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোন আসামিকে রিমান্ডে নেয়ার জন্য সব গ্রাউন্ড বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন এবং আদালতের সামনে সন্তুষ্টির জন্য কেচ ডায়েরি উপস্থাপন করবেন। আদালত যদি মনে করেন আসামিকে পুলিশ হেফাজতে বা রিমান্ডে দেয়ার দরকার আছে তাহলে তিনি আদেশে রিমান্ড দেয়ার কারন লিপিবদ্ধ করে তা মন্জুর করবেন।ম্যাজিষ্ট্রেট সন্তুষ্টি না হলে রিমান্ড নামন্জুরও করতে পারেন ।(নির্দেশনা-২):যদি হাকিম সাহেব রিমান্ড মন্জুর করেন তাহলে তদন্তকারী কর্মকর্তার হেফাজতে পাঠানোর পূর্বে আসামিকে একজন ডেজিগনেটেড ডাক্তার বা এই উদ্দেশ্যে গঠিত মেডিকেল বোর্ড দ্বারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে এবং সেই ডাক্তারি পরীক্ষা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। নির্দেশনা ৩):রিমান্ডে নেয়ার পর শুধু তদন্তকারী কর্মকর্তাই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অধিকারী হবেন এবং রিমান্ডের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর আসামিকে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করবেন। আসমি যদি কোন নির্যাতনের অভিযোগ জানায় তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষনিক আসামিকে সেই ডাক্তার বা মেডিকেল বোর্ডের কাছে পাঠাবেন।(নির্দেশনা ৪):বিচারক যদি ডাক্তার বা মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্টে পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন আসামিকে আঘাতের চিহ্ন পান তাহলে তিনি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফোজদারি কার্যবিধির ১৯০(১) (গ)এর অধিনে দন্ডবিধির ৩৩০ ধারা মোতাবেক আসামি কতৃক কোন প্রকার পিটিশন দায়ের ছাড়াই অপরাধ আমলে নেবেন।
লেখক:ডক্টর এম,এমদাদুল হক,আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট,(ইভিনিং চেম্বার:দ্যা প্লিডার্স টেম্পল,স্যুট নং ২০৭, ২য় তলা,আয়েশা শপিং কমপ্লেক্স, মৌচাক,মালিবাগ,ঢাকা,মোবাইল নং-০১৭২৫৬৪৭২৬১.০১৯১২৮৮০১৭৩(রেফারেন্স বুক:-থানায় আপনার অধিকার,অ্যডভোকেট আজিজুুর রহমসন দুলু)
Leave a Reply