ফেরদৌসী মজুমদার। অনন্য এক অভিনয়শিল্পী। মঞ্চেই তিনি প্রথমা, মঞ্চেই তিনি প্রথিতযশা এবং মঞ্চেরই তিনি প্রাণ। আমাদের অভিনয় জগতের অন্যতম দিকপাল। এ দেশে থিয়েটারের যাত্রা তিনি এবং তারই মতো অসাধারণ কিছু মানুষের হাত ধরেই যাত্রা শুরু করেছিল। তাকে ছাড়া আমাদের থিয়েটার কল্পনাতীত। বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের মঞ্চনাটক আর ফেরদৌসী মজুমদার একে অন্যের পরিপূরক। বলা ভালো মঞ্চের সম্রাজ্ঞী তিনি। হাজারেরও বেশিবার মঞ্চে আলো ছড়িয়েছেন এই ব্যক্তিত্ব। অবশ্য অসংখ্য টিভি নাটকের অভিনয় দিয়েও নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। বাংলাদেশের মঞ্চ ও টেলিভিশনে তার নানা ধরনের স্মরণীয় চরিত্রচিত্রণ এখনো দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। এর মধ্যে পার করেছেন অভিনয় জীবনের ৫০ বছর। এই ৫০ বছরে বাংলাদেশের নাট্যজগতে তৈরি হয়েছে তার স্বতন্ত্র একটি অবস্থান। মঞ্চ-দূরদর্শন-বেতার-চলচ্চিত্র-সাহিত্য শিক্ষা প্রভৃতি মাধ্যমে ফেরদৌসী মজুমদারের বলিষ্ঠ উপস্থিতি ধূমকেতুর আলোর রোশনাই ছড়িয়ে বিলীন হয়ে যাওয়া নয়, ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে চিরন্তন জ্বলছেন। তিনি এখনো অপরকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাচ্ছেন।
একুশে পদকজয়ী অনন্য এই শিল্পীর করোনাকাল কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনাকালে আমার অনেক কাজ বেড়ে গেছে। আমি সানবীম স্কুলে শিক্ষকতা করি। যে কারণে সময়াভাবে ঘরের কোনো কাজই করতে পারতাম না। এই করোনাকালে ঘরদোর একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টা করছি। রান্না-বান্নাও করতে হচ্ছে। কারণ এখন কাজের সহকারীও তো নাই। অবশ্য এটা একদিক থেকে ভালোই। আগে ওরাই সব করত। মাঝে আমার কোনো কাজই করা হতো না। এখন আবার করতে হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন জনের অনুরোধে বাড়িতে থেকে একটু-আধটু অভিনয় করে তা ভিডিও করে পাঠাচ্ছি। এর ফাঁকে একটা অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ করতে পারিনি। এতো বিশাল বিশাল জ্ঞানীগুণীজন মারা যাচ্ছেন তাদের সম্পর্কে লিখেছি। মনের অবস্থা একেবারেই ভালো নয়। ধীরে ধীরে সব নিভে যাচ্ছে। সামনে তো কোনো আলো নেই। ভেতরটা বড্ড এলোমেলো হয়ে আছে। মনে শান্তি নেই। যে কারণে সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশও করা যাচ্ছে না। তবে বইপত্র পড়ছি। পাশাপাশি আমার স্কুলের লেসনপ্ল্যানগুলো দেখছি। এখন অনলাইনে ক্লাস চলছে। যে কোনো সময় স্কুল খুলে যেতে পারে।
নাটক নিয়ে কিছু ভাবছেন কিনা জানতে চাইলে বরেণ্য এই শিল্পী বলেন, নাটকের কথা এখন ভাবছিই না। এখন বাঁচার কথাই ভাবছি। যদিও আমি অভিনয় ভালোবাসি। এর জন্যই বেঁচে থাকার সাহস পাই। অভিনয় আমার উপাসনা। আসলে যে কোনো কাজেই নিষ্ঠা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এ মুহূর্তে বাঁচার কথাটাই যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে।
করোনার এই সময়টাতে আপনার চেনা পৃথিবীর কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন, তা কেমন? জবাবে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, আমাদের দেশের মানুষ তো মোটেও সচেতন নয়। এক্ষেত্রে করোনার অভিঘাত একদিক থেকে খুবই ভালোই হয়েছে। মানুষ বিধি মতো স্বাস্থ্যসম্মতভাবে জীবনযাপন করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ডাক্তারের পরামর্শমাফিক চলার চেষ্টা করছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাটা কতটা দরকার অন্তত মানুষের সেই উপলব্ধিটা হচ্ছে। প্রতিবার হাত ধোয়া, মুখে মাস্ক লাগানোর এই অভ্যাসটা পালন করতে থাকলে একসময় অভ্যাসটা মানুষের থেকে যাবে। করোনার আগে কেউ কেউ দেখেছি মাস্ক পরতে, আমাদের স্কুলেও একজন আছেন যিনি সবসময় মাস্ক পরেন। তার সেই অভ্যাসটার কথা এখন চিন্তা করি এবং ভাবি মাস্ক পরা কতটা জরুরি। করোনার এই উছিলাতে বাংলাদেশের মানুষ অন্তত স্বাস্থ্য সচেতন হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। এই অভ্যাসটা যদি থেকে যায় এটাই হবে আমাদের লাভ।
আরেকটা কথা এই করোনাকালে সবচেয়ে বেশি খুশি প্রকৃতি। কারণ এখন প্রকৃতিকে কেউ বিরক্ত করছে না। টেলিভিশনে দেখলাম ডলফিনরা সাগরের পাড়ে চলে এসেছে। পুকুরের মাছ, পাখি এখন মুক্ত। করোনা ভাইরাস আমাদের কিছু জিনিস উপলব্ধি করিয়েছে, যা আমরা কখনো ভাবিনি।
সেদিন টিভিতে দেখলাম খুলনা কিংবা কোনো অঞ্চলের চরের ছবি, যেখানে লাখ লাখ পাখি আনন্দে নাচছে। কেউ তাদের গুলিও করছে না, বিরক্ত করছে না। এই স্বাধীনতা তারা আগে কখনো কি পেয়েছে? ঠিক তেমনি আমরা প্রকৃতিকে অবহেলা করেছি বলেই আজ আমাদের এই অবস্থা। আমরা নিজেদের প্রয়োজনে খাল, নদী, বন, জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস করেছি। সব কেটে সাবাড় করে বিল্ডিংয়ের ওপর বিল্ডিং বানাচ্ছি। আমরা চারদিক এতো দূষিত করেছি যে স্বাস্থ্যকর সমীরণ বইতে পারছে না। প্রকৃতির ওপর অনাচারের কুফল তো আছেই। যা একসময় ফিরে আসে। বরং বলা ভালো, প্রকৃতির ওপর হামলার কারণেই মানুষ এতো ভোগান্তির শিকার। এখন প্রকৃতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। সব কিছু উজাড় করে ইট-পাথর দিয়ে দালান করলে তো হবে না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বাঁচাতে হবে প্রকৃতির অপরূপ রূপও।
আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব। যে কোনো দুরবস্থাকে মোকাবিলা করতে একটু সময় লাগে। আমাদেরও লাগবে। যেহেতু এটা বৈশ্বিক বিপর্যয়। কিন্তু আগে তো জীবন। আগে আমরা বাঁচি। তারপর অর্থনীতি। জীবিকার তাগিদে এখন সব খুলে দেয়া হয়েছে। এতে করে মৃত্যুর হার আরো অনেক বেড়েছে। তারচেয়ে বরং বন্ধ থাকলেই ভালো হতো। আমার কথা হচ্ছে আগে মানুষ বাঁচান, তারপর জীবিকা। এমন তো নয় যে আমরা না খেয়ে শুকিয়ে মরব। কম খাব। মানুষের পাশে দাঁড়াব। আমাদের একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হবে। একা আমি বাঁচলে তো হবে না। অন্যকেও বাঁচাতে হবে।
মনে করুন এখন যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ হলেই যদি মানতে পারি, কারফিউ মানতে পারি, বাইরে যেতে না পারি, অল্প খাবার খেতে পারি, মানুষের কথা ভাবতে পারি। তাহলে এখন পারব না কেন?
আমাদের দেশের মানুষ সচেতন নয়। তারা এখনো লকডাউন মানছে না। নিজেদের ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি করছে, যত্রতত্র থুতু-কফ ফেলছে। বাজার করছে এমনভাবে যেন একাই বেঁচে থাকবে, ভালো থাকবে। ত্রাণ নিয়ে যা হচ্ছে, তাতে মানুষের অমানবিক দিকটা বড্ড প্রকট হয়ে উঠছে। এসব বোঝানোর জন্যই বোধ হয় বিধাতা পৃথিবীতে এই পরিস্থিতি দিয়েছেন। যদিও আমি মনে করি, এই আঁধার কেটে যাবে।
আমাদের ভাবতে হবে, ডাক্তারদের কথা। যারা আমাদের জীবন বাঁচাচ্ছেন তারাই চলে যাচ্ছেন। অথচ তারাই বড় যোদ্ধা। তারা নিজের জীবন বিপন্ন করে, জীবনবাজি রেখে করোনাক্রান্তদের বাঁচাচ্ছেন। তাদের জন্য আমাদের সহানুভ‚তিটা থাকা উচিত।
Leave a Reply