হামিদুজ্জামান খান। দেশের অন্যতম প্রধান ভাস্কর। স্বাধীনতার পর যে শিল্পীদের চর্চায় বাংলাদেশের ভাস্কর্যচর্চা প্রসার লাভ করে, লাভ করে গ্রহণযোগ্যতা তাদের মধ্যে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেছেন শিল্পী হামিদুজ্জামান খান। যার ভাস্কর্য ও জলরঙের কাজ দেখে বিস্ময়ে চোখ জুড়িয়ে যায়! মনে হয়, এসব তিনি নির্মাণ করেছেন প্রাকৃতিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। জলরঙের কাজ দেখে মনে হয়, নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে তার স্টাইল। বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে তার অবস্থান। যেখানে তিনি একা, তাকে ঘিরে আছে প্রকৃতি, সেখানে তার অভিজ্ঞতা বিভিন্ন দিকে হাত বাড়িয়ে আছে, এসব অভিজ্ঞতাই তাকে শিল্পী করে তুলেছে। নিয়মিত ভাস্কর্য শিল্পের পাশাপাশি চর্চা করেন জলরং, তৈলচিত্রের।
বঙ্গভবনের ভেতর ‘পাখি পরিবার’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘সংশপ্তক’ হামিদুজ্জামানকে পরিচিত করেছে সাধারণের কাছেও। এছাড়া নগরীজুড়ে, দেশজুড়ে প্রচুর ভাস্কর্য গড়ে উঠেছে এই শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায়। উদ্যান ও সড়কদ্বীপে স্থাপিত হয়েছে। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও সমান জনপ্রিয় আধুনিক এই ভাস্কর্য শিল্পী। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল অলিম্পিক পার্কে একজন প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তার একাধিক শিল্পকর্ম স্থাপিত হয়েছে। অলিম্পিক পার্ক ছাড়াও আরো কয়েকটি পার্কে তার কাজ স্থান পেয়েছে।
হামিদুজ্জামান খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘ সময়। বর্তমানে ভাস্কর্য বিভাগের অনারারি অধ্যাপক। শিল্পকলা পুরস্কারসহ একুশে পদকে ভূষিত খ্যাতিমান এই ভাস্করের করোনাকাল কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আঁকাআঁকি করেই সময়টা কাটাচ্ছি। আমার আঁকা এইসব ছবির বেশিরভাগই সাদাকালো। তাতে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপকভাবে করোনার প্রভাব পড়েছে। করোনা বদলে দিচ্ছে ছবির রংও। এই লকডাউনে অনেকগুলো ছবিই আঁকলাম সবগুলোতেই ছড়িয়ে আছে করোনার ফর্ম।
এছাড়া পড়ছি। সব সময়ই পড়াশোনা করি। প্রচুর ভালো ভালো বইয়ের কালেকশান আছে আমার। ইদানীং নতুন করে আবার রবী ঠাকুর পড়ছি। তাঁর জীবদ্দশায় অনেকে তাঁর সমালোচনা করত, কেন সমালোচনা করত, তিনি এসব সমালোচনার কী উত্তর দিতেন। এসব লেখা আবার নতুন করে পড়ছি। বেশ ভালো লাগছে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের আরো বই পড়ছি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে।
করোনার এই সময়টায় আপনার চেনা পৃথিবী কি বদলে গেছে বলে মনে করছেন, তা কেমন? জবাবে এই শিল্পী বলেন, আমার তো মনে করো না আমাদের একেবারে আমূল বদলে দিয়েছে। প্রকৃতি একেবারে বদলে গেছে। আমার বাসার উপরে একটা ঘাস বিছানো বাগান আছে, যেখানটায় আমি প্রায়ই সময় কাটাই। ইদানীং সেখানটায় বসলে মনে হয়, আকাশের চেহারা বদলে গেছে। বৃষ্টির স্বভাবও পাল্টে গেছে। এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে তা আগের মতো নয়। এর চরিত্র একেবারেই ভিন্ন। এখন ঝিরি ঝিরি বাদলা বৃষ্টি হচ্ছে। এমন বৃষ্টি কোনোদিন দেখিনি আমি। প্রকৃতি বেশ পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি তো গ্রামে বড় হয়েছি সেখানে দেখেছি, আগে মেঘলা হতো আকাশ, তারপর বৃষ্টি নামত। আমার বাড়ির বাগানটার কথা বললাম না, যেখানে নানা গাছের সমাহার, সেখানে নানা জাতের ফুল ফুটছে। ফুলের সৌন্দর্যেরও অপরূপ রূপ দেখতে পাচ্ছি। বেশ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ফুলের হাসিতেও। করোনার আগে এই সৌন্দর্য দেখা যায়নি। পাখিদের ওড়াউড়িও দেখছি বেশ। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে অনেক দূষণ কমে গেছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন একেবারে চোখে পরার মতো।
করোনার এই অভিঘাত থেকে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে হয়? জবাবে এই আত্মপ্রত্যয়ী ভাস্কর বলেন, আমি তো খুব আশাবাদী। সব কিছুরই একটা ক্লাইমেক্স আছে। আমরাও তো এখন ক্লাইমেক্সে আছি। এর ধাক্কা সামলানো কঠিন। কিন্তু সরকার চেষ্টা করছে। এই করোনার সময়ই তো ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পরলাম আমরা। কাটিয়েও তো উঠেছি।
আমি আশাবাদী, অচিরেই করোনার এই মেঘও কেটে যাবে। আমাদের দেশের মানুষ তো খেটে খাওয়া মানুষ। লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষ।
Leave a Reply