জাতীয়তা, জন্মস্থান, নারী-পুরুষ ভেদ, জাতীয় অথবা নৃ-গোষ্ঠীগত পার্থক্য; বর্ণ, ধর্ম, ভাষা অথবা অন্য কোনো মর্যাদাভেদে মানবাধিকার সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। সব মানুষ কোনো ধরনের বৈষম্য ব্যতিরেকে সমভাবে মানবাধিকারগুলো উপভোগের অধিকারপ্রাপ্ত। এ অধিকারগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত, পরস্পর নির্ভরশীল এবং অবিভাজ্য। সর্বজনীন মানবাধিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদ ও চুক্তি দ্বারা স্বীকৃত। মানবাধিকারগুলো অবিচ্ছেদ্য। বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনের যথাযথ অনুসরণ ব্যতীত এসব অধিকার হরণ করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো ব্যক্তি একমাত্র আদালত কর্তৃক কোনো অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে তার মৌলিক অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপযোগ্য। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার যাই হোক না কেন, সব মানবাধিকার অবিভাজ্য। যেমন জীবনের অধিকার, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা; অথনৈতিক, সামাজিক ও সাস্কৃতিক অধিকার। কর্মের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষা অথবা সমষ্টিগত অধিকার, যেমন উন্নয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অবিচ্ছেদ্য, পরস্পর সম্পর্কযুক্ত, পরস্পর নির্ভরশীল। একটি অধিকারের উন্নয়ন অপরাপর অধিকারের অগ্রসরতা সহজতর করে। সমভাবে একটি অধিকারের বঞ্চনা অপরাপর অধিকারে প্রতিকূলভাবে ব্যাঘাত ঘটায়।
পৃথিবী সৃষ্টির পর এ পৃথিবীতে মানুষের আগমন পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, যে অঞ্চলে জীবনযাপন সহজতর, মানুষ বসবাস ও জীবিকার তাগিদে সে অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়েছে। মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা অদ্যাবধি অব্যাহত আছে এবং বর্তমানেও দেখা যায় মানুষ অর্থনৈতিকভাবে কমসমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে অধিকসমৃদ্ধ অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়ে চলেছে। একদা ইউরোপ পৃথিবীর সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল ছিল। ইউরোপীয়দের আমাদের এ উপমহাদেশে উন্নত ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনের লক্ষ্যে আগমন ঘটেছিল। বর্তমানে পৃথিবীর দেশ সমৃদ্ধঅঞ্চল হিসেবে বিবেচিত, যেমন উত্তর আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরভুক্ত অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড- এসব স্থানে জীবনমান ও ভাগ্যোন্নয়নের প্রয়োজনে ইউরোপীয়রা পাড়ি জমিয়েছিল। পৃথিবীর এসব উন্নত ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে ইউরোপীয়দের প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার নাগরিকদের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপিত ছিল।
উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড অভিবাসীদের দেশ হলেও উত্তর আমেরিকাভুক্ত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ব্রিটিশ, স্কটিশ ও আইরিশ বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গপ্রধান দেশ। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধিকসংখ্যক অভিবাসী রয়েছে। এ অভিবাসীদের মধ্যে হিস্পানিক বা ল্যাটিনোদের পরই কালোদের অবস্থান। এর পরের অবস্থান হল এশীয়দের। এদেরও শ্বেতাঙ্গদের মতো অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঘটেছে; তবে শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে এদের পার্থক্য হল সেখানে কৃষি ও উন্নয়ন সংশ্লেষে শ্রমের প্রয়োজন দেখা দিলে এদের অনেককে দাস হিসেবে, আবার অনেককে দক্ষ ও বিশেষায়িত মানুষ হিসেবে নেয়া হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য পারস্পরিক দেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত হলেও পৃথিবীর অবশিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের উপরোক্ত দেশগুলোতে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদ, ১৯৪৮-এ যেসব অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের সংবিধানে সেসব অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। চলাফেরার স্বাধীনতা মানুষের একটি সহজাত অধিকার; কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এ অধিকারটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য সমভাবে উন্মুক্ত নয়। চলাফেরার স্বাধীনতা বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক দেশের নাগরিকের নিজ দেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার থাকবে। এ অধিকারটি মানুষের সহজাত বিধায় পৃথিবীর যে কোনো একটি দেশের মানুষের জন্য পৃথিবীর যে কোনো অঞ্চলে চলাফেরার জন্য উন্মুক্ত থাকা অত্যাবশ্যক ছিল।
মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দাবি, তারা স্বদেশে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানবাধিকারের বিষয়ে যতটুকু সচেষ্ট, পৃথিবীর অন্য দেশ সেভাবে সচেষ্ট নয়; কিন্তু তাদের এ দাবি যে আদৌ সঠিক নয় তা বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে ঘটে যাওয়া বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনাবলির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে উপলব্ধি করা সহজ হবে।
মধ্যপ্রাচ্য তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ হওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলটির ওপর বিশ্ব মানবাধিকারের তথাকথিত প্রবক্তা য্ক্তুরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে। এ দুটি দেশ ক্ষমতাধর দেশ হিসেবে নিজেদের ইচ্ছামতো অঞ্চলটিকে বিভাজিত করে তাদের প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের ক্ষমতাসীন করার প্রয়াস নেয়। সময়ের প্রেক্ষাপটে এদের উত্তরসূরি কেউ কেউ জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলে এবং এর ফলে এদের ওপর তথাকথিত মানবাধিকারের প্রবক্তা প্রভুরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ শিথিলতর হওয়ার উপক্রম ঘটলে তারা অনুধাবন করতে সক্ষম হয় এভাবে হয়তো সে অঞ্চলের তেল ও গ্যাস সম্পদের ওপর তাদের কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব হবে না। এ উপলব্ধি থেকেই তাদের ইন্ধনে প্রথমত ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের মাধ্যমে ইরান আক্রমণের ঘটনা ঘটানো হয়। ইরাক ও ইরান যুদ্ধ তাদের কাক্সিক্ষত ফলাফল না দিলে এরপর তারা সাদ্দাম কর্তৃক কুয়েত দখল করিয়ে একে আগ্রাসন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস নিয়ে সফলকাম হয়। অতঃপর সাদ্দামের কাছে মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্র ও জীবাণু অস্ত্র রয়েছে, এ অলীক অজুহাতে তাদের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী দ্বারা ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দামের পতন ঘটায় এবং এরপর প্রহসনমূলক বিচারে ফাঁসিকাষ্ঠে তার মৃত্যু কার্যকর করে। সাদ্দামের বিদায়-পরবর্তী সময়ে ইরাকসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে তা অদ্যাবধি অব্যাহত আছে। ইরাকের মতো আরবি ভাষাভাষী উত্তর আফ্রিকার অন্তর্ভুক্ত তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র লিবিয়া গাদ্দাফির শাসনামলে প্রভূত উন্নতিসাধন করেছিল। সাদ্দামের মতো গাদ্দাফি তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করায় তা পশ্চিমাশক্তি তথাকথিত মানবাধিকারের প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের স্বার্থের হানিকর বিবেচিত হওয়ায় তারা জাতিগত দাঙ্গা উসকে দিয়ে দেশটিকে অস্থিতিশীল করে এবং গাদ্দাফি দ্বারা দেশটিতে মানবাধিকার চরমভাবে লংঘিত হচ্ছে এরূপ অজুহাত সৃষ্টি করে তথায় বহুজাতিক বাহিনী প্রবেশ করিয়ে নৃশংসভাবে গাদ্দাফিকে হত্যা করে। দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ায় বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সশস্ত্র যুদ্ধ চলছে, এর পেছনে রয়েছে পশ্চিমাদের ইন্ধন ও সমর্থন। অনুরূপ আইএস সৃষ্টি করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করার পেছনেও রয়েছে এদের প্রত্যক্ষ সামরিক ও আর্থিক সহায়তা।
Leave a Reply